ভূমিকা

বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় ভাতের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সাধারণ চালের পাশাপাশি বর্তমানে সরু, চিকন, সুগন্ধি ও উন্নত মানের চালের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। পোলাও, বিরিয়ানি, কাচ্চি, জর্দা, পায়েশসহ বিভিন্ন উন্নতমানের খাবারে সুগন্ধি চিকন চালের ব্যবহার বেশি হওয়ায় এ ধরনের ধানের বাজারমূল্য সাধারণ ধানের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। কৃষি তথ্য সার্ভিসও বলছে, সুগন্ধি চালের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা রয়েছে এবং বাণিজ্যিকভাবে এ ধরনের ধান চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট—ব্রি উদ্ভাবিত ব্রি ধান১০৪ বোরো মৌসুমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুগন্ধি ধানের জাত। এটি সাধারণ সুগন্ধি ধানের তুলনায় উচ্চফলনশীল এবং এর চাল অতিরিক্ত লম্বা ও চিকন, সাদা এবং বাসমতি টাইপের। ব্রির তথ্য অনুযায়ী, ব্রি ধান১০৪-এর গড় জীবনকাল প্রায় ১৪৭ দিন, গড় ফলন ৭.২৯ টন/হেক্টর এবং অনুকূল পরিবেশ ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় সম্ভাব্য ফলন ৮.৭১ টন/হেক্টর পর্যন্ত হতে পারে। তাই উচ্চমূল্যের সুগন্ধি চালের বাজারকে লক্ষ্য করে ব্রি ধান১০৪ চাষ বাংলাদেশের কৃষকের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক ফসল হতে পারে। তবে শুধু বেশি দামের আশায় জাতটি চাষ করলেই লাভ নিশ্চিত হবে না। ভালো বীজ, সঠিক সময়ে বীজতলা, উপযুক্ত বয়সের চারা, সুষম সার, সঠিক সেচ, রোগ-পোকা ব্যবস্থাপনা এবং ধান কাটার পর সঠিকভাবে শুকানো ও সংরক্ষণ—সবকিছুর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

ব্রি ধান১০৪ কেন বিশেষ

ব্রি ধান১০৪ বোরো মৌসুমে সেচনির্ভর পরিবেশের জন্য উদ্ভাবিত বাসমতি টাইপের সুগন্ধি ধান। জাতীয় বীজ বোর্ড ২০২২ সালে বোরো মৌসুমে বাণিজ্যিক চাষের জন্য জাতটি অনুমোদন করে। গবেষণা-ভিত্তিক প্রকাশনায় জাতটির গড় গাছের উচ্চতা প্রায় ৯২ সেন্টিমিটার এবং গড় পরিপক্বতার সময় ১৪৭ দিন উল্লেখ করা হয়েছে। জাতটির অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর চালের আকার। এটি অতি লম্বা ও চিকন, সাদা এবং বাসমতি ধরনের। ব্রির তথ্য অনুযায়ী ১,০০০টি পুষ্ট ধানের ওজন গড়ে ২১.৫ গ্রাম, অ্যামাইলোজ প্রায় ২৯.২ শতাংশ এবং প্রোটিন প্রায় ৮.৯ শতাংশ। রান্না করা ভাত ঝরঝরে হওয়ার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। ব্রি ধান১০৪-এর সুগন্ধও উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় GCMS বিশ্লেষণে volatile aromatic compound-এর মান ২.১২ ppm পাওয়া গেছে বলে প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণে জাতটি বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত সুগন্ধি চালের পাশাপাশি বাসমতি-ধাঁচের প্রিমিয়াম চাল উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার বাসমতি’ বলা হলেও একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি

ব্রি ধান১০৪-এর চাল বাসমতি টাইপের। অর্থাৎ চালের আকৃতি, চিকনত্ব, সুগন্ধ ও রান্নার বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এটি বাসমতির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এটিকে আন্তর্জাতিকভাবে উৎপাদিত নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয়ের ভারতীয় বা পাকিস্তানি বাসমতি হিসেবে দাবি করা ঠিক নয়।

ওয়েব পোর্টালের লেখায় তাই “বাংলার বাসমতি”, “বাসমতি টাইপ” বা “বাসমতি-ধাঁচের সুগন্ধি চাল” শব্দ ব্যবহার করা তথ্যগতভাবে বেশি যথাযথ।

জমি নির্বাচন

ব্রি ধান১০৪ বোরো মৌসুমের সেচনির্ভর ধান। তাই জমি নির্বাচনের সময় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। জমি মাঝারি উঁচু থেকে মাঝারি নিচু হতে পারে, তবে এমন জমি ভালো যেখানে সেচের পানি সহজে দেওয়া যায় এবং প্রয়োজনে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া যায়। দো-আঁশ, পলি দো-আঁশ ও উর্বর মাটি ধান চাষের জন্য উপযোগী। জমিতে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা থাকলে তা এড়িয়ে চলা ভালো। একই সঙ্গে এমন জমি নির্বাচন করা উচিত যেখানে আগাছা নিয়ন্ত্রণ, সেচ, সার প্রয়োগ ও ফসল সংগ্রহের জন্য যন্ত্রপাতি সহজে ব্যবহার করা যায়।

বীজ নির্বাচন—সফল চাষের প্রথম শর্ত

সুগন্ধি ধানের ক্ষেত্রে বীজের বিশুদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই জমিতে অন্য জাতের ধান মিশে গেলে উৎপাদিত চালের আকার, গন্ধ ও বাজারমূল্য কমে যেতে পারে। তাই বিশ্বস্ত উৎস থেকে প্রত্যয়িত বা মানসম্মত ব্রি ধান১০৪-এর বীজ সংগ্রহ করা উচিত। আগের মৌসুমের জমি থেকে নিজের মতো করে বীজ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে জাতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত না হলে বাণিজ্যিক মানের ধান পাওয়া কঠিন হতে পারে। বীজ সংগ্রহের সময় জাতের নাম, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, বীজের মান ও অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন।

বীজতলা তৈরির সময়

বোরো মৌসুমের জন্য সাধারণভাবে ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে বীজতলায় বীজ বপনের পরিকল্পনা করা যায়। ব্রি ধান১০৪-এর গবেষণা-পরীক্ষায় প্রায় ৩৫ দিনের চারা ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রোপণের উদাহরণ রয়েছে। তবে স্থানীয় তাপমাত্রা, বীজতলার পরিবেশ, সেচ সুবিধা ও রোপণের নির্ধারিত সময় বিবেচনা করে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে সময় সামান্য এগিয়ে-পিছিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

বীজতলা তৈরির পদ্ধতি

বীজতলার জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে মিহি করে নিতে হবে। বীজতলা এমনভাবে তৈরি করা উচিত যাতে সেচ দেওয়া এবং অতিরিক্ত পানি বের করা দুটোই সহজ হয়। বীজ বপনের আগে ভালো বীজ বাছাই করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী বীজ শোধন করলে বীজবাহিত রোগের ঝুঁকি কমানো যায়। বীজ শোধনের জন্য স্থানীয়ভাবে অনুমোদিত পদ্ধতি ও কৃষি বিভাগের সুপারিশ অনুসরণ করা উচিত। বীজতলায় অতিরিক্ত ঘন করে বীজ বপন করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত ঘন চারা হলে চারা দুর্বল ও রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

চারা রোপণের উপযুক্ত বয়স

ব্রি ধান১০৪-এর ক্ষেত্রে প্রায় ৩৫ দিনের চারা রোপণের গবেষণা-উদাহরণ রয়েছে। চারা খুব বেশি বয়সী হলে রোপণের পর দ্রুত ও শক্তিশালী কুশি গঠন ব্যাহত হতে পারে। আবার অত্যন্ত কচি চারা ঠান্ডা ও মাঠের পরিবেশে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। চারা তোলার সময় শিকড়ের ক্ষতি যতটা সম্ভব কম করতে হবে।

জমি প্রস্তুতি

ধানের জমি কয়েকবার চাষ ও মই দিয়ে মিহি করতে হবে। জমিতে বড় ঢেলা, আগাছা ও আগের ফসলের অবশিষ্টাংশ থাকলে তা অপসারণ করতে হবে। শেষ চাষের সময় জমি সমতল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি সমতল না হলে কোথাও বেশি পানি এবং কোথাও কম পানি থাকবে। এতে সার ও সেচের কার্যকারিতা কমে এবং ধানের বৃদ্ধি অসম হয়। জমি প্রস্তুতির সময় পচা গোবর বা কম্পোস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে জৈব সার ভালোভাবে পচানো হতে হবে।

চারা রোপণের দূরত্ব

ব্রি ধান১০৪ নিয়ে ব্রির গবেষণা পরীক্ষায় ২০ × ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে চারা রোপণের উদাহরণ পাওয়া যায়। প্রতি গোছায় প্রয়োজন অনুযায়ী সুস্থ চারা ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত চারা গুঁজে দেওয়া উচিত নয়। অতিরিক্ত ঘনত্বে গাছের মধ্যে আলো-বাতাস চলাচল কমে গিয়ে রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং অপ্রয়োজনীয় কুশি তৈরি হতে পারে। তবে জমির উর্বরতা, চারা বয়স ও স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী রোপণ দূরত্ব সামান্য সমন্বয় করা যেতে পারে।

সার ব্যবস্থাপনা: বেশি সার নয়, সুষম সার

ব্রি ধান১০৪ উচ্চমূল্যের ধান হলেও বেশি ইউরিয়া প্রয়োগ করলেই ফলন বেশি হবে—এ ধারণা ভুল। অতিরিক্ত নাইট্রোজেন প্রয়োগ গাছকে অতিরিক্ত নরম ও সবুজ করে তুলতে পারে এবং রোগ ও পোকামাকড়ের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সারের পরিমাণ নির্ধারণের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো মাটি পরীক্ষা করে Soil Test Based (STB) সার সুপারিশ অনুসরণ করা। সাধারণভাবে ধানের জমিতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ, সালফার ও প্রয়োজন অনুযায়ী জিংকের ভারসাম্য নিশ্চিত করতে হবে। ফসফরাস, পটাশ, সালফার ও জিংকের প্রয়োজনীয় অংশ জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে প্রয়োগ করা যায় এবং ইউরিয়া ভাগ করে প্রয়োগ করা উত্তম। ব্রি’র সাম্প্রতিক গবেষণায় ব্রি ধান১০৪-এর জন্য মাটির পরীক্ষাভিত্তিক সারের বিভিন্ন সমন্বয় নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে ইউরিয়া তিন ভাগে—এক ভাগ জমি তৈরির সময়, এক ভাগ রোপণের ২৫–৩০ দিন পর এবং অবশিষ্ট অংশ শীষ আসার প্রায় পাঁচ দিন আগে—প্রয়োগের একটি পরীক্ষামূলক ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে এটি গবেষণা-পরীক্ষার ব্যবস্থাপনা; সব জমির জন্য একই সার মাত্রা সরাসরি প্রয়োগ করা উচিত নয়। মাটির উর্বরতা অনুযায়ী উপজেলা কৃষি অফিস বা মৃত্তিকা পরীক্ষার সুপারিশ অনুসরণ করাই নিরাপদ।

জৈব সার ব্যবহারের গুরুত্ব

সুগন্ধি ধানের মান বজায় রাখতে জমির মাটির স্বাস্থ্য ভালো রাখা জরুরি। পচা গোবর, কম্পোস্ট বা অন্যান্য মানসম্মত জৈব সার মাটির জৈব পদার্থ বাড়াতে সাহায্য করে। তবে জৈব সার প্রয়োগের পরিমাণও মাটির অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। কাঁচা গোবর বা অপরিপক্ব জৈব পদার্থ ব্যবহার না করে ভালোভাবে পচানো জৈব সার ব্যবহার করা উচিত।

সেচ ব্যবস্থাপনা

বোরো ধান সেচনির্ভর হওয়ায় পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে পুরো মৌসুম জমিতে সবসময় দাঁড়ানো পানি রাখা প্রয়োজন নেই। ধানের বৃদ্ধির বিভিন্ন পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে। জমিতে অতিরিক্ত পানি জমে থাকলে শিকড়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং সেচের খরচ বাড়ে।

বিশেষ করে—

  • রোপণের পর চারা প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা রাখতে হবে।
  • কুশি গঠনের সময় পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে হবে।
  • শীষ গঠন ও ফুল আসার সময় পানির ঘাটতি হতে দেওয়া যাবে না।
  • ধান পাকার শেষ পর্যায়ে অতিরিক্ত সেচ এড়িয়ে চলতে হবে।
  • কাটার আগে জমি শুকিয়ে আনার পরিকল্পনা করতে হবে।

সেচের পানি ব্যবস্থাপনায় Alternate Wetting and Drying (AWD) ধরনের পানি-সাশ্রয়ী পদ্ধতি স্থানীয় সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে।

আগাছা ব্যবস্থাপনা

রোপণের প্রথম ৩০–৪০ দিন আগাছা নিয়ন্ত্রণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আগাছা ধানের সঙ্গে পানি, আলো, পুষ্টি ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করে। প্রথম দিকে হাত দিয়ে আগাছা পরিষ্কার, উইডার ব্যবহার অথবা অনুমোদিত আগাছানাশক প্রয়োগ করা যায়। রাসায়নিক আগাছানাশক ব্যবহার করলে ধানের জাত, আগাছার ধরন ও জমির অবস্থা অনুযায়ী কৃষি কর্মকর্তার সুপারিশ অনুসরণ করতে হবে।

রোগ ও পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা

ব্রি ধান১০৪-এর মতো উচ্চমূল্যের ধানে অযথা কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রথমে জমি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বোরো ধানে ব্লাস্ট, ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা পোড়া, বাদামি দাগসহ বিভিন্ন রোগ এবং মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িংসহ বিভিন্ন পোকামাকড় দেখা দিতে পারে। রোগ বা পোকা দেখা দিলে প্রথমে সঠিকভাবে শনাক্ত করতে হবে। বিশেষ করে সুগন্ধি ধানের ক্ষেত্রে রোগের আগাম পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি তথ্য সার্ভিসের সুগন্ধি ধানবিষয়ক নির্দেশনায় ব্লাস্ট রোগের বিষয়ে সতর্ক থাকার কথা বলা হয়েছে। রোগ বা পোকার আক্রমণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মাত্রায় পৌঁছালে কেবল বাংলাদেশে অনুমোদিত বালাইনাশক, সঠিক মাত্রা ও নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবধান মেনে ব্যবহার করতে হবে।

ধানের সুগন্ধ ও মান বজায় রাখতে পরিচর্যা

ব্রি ধান১০৪-এর অন্যতম প্রধান সম্পদ হলো এর সুগন্ধি ও প্রিমিয়াম মানের চাল। তাই চাষের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জাতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখা জরুরি। জমিতে অন্য জাতের ধান মিশে গেলে আলাদা জাতের দানা মিশ্রিত হয়ে চালের বাজারমান কমতে পারে। এজন্য—বিশুদ্ধতা → জমিতে জাতের বিশুদ্ধতা → রোগমুক্ত ফসল → সঠিক সময়ে কাটা → আলাদাভাবে মাড়াই → পরিষ্কারভাবে শুকানো → আলাদাভাবে সংরক্ষণ। এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন।

ধান কাটার সঠিক সময়

ধানের অধিকাংশ দানা পেকে হলুদ-সোনালি হয়ে গেলে এবং দানার আর্দ্রতা উপযুক্ত পর্যায়ে এলে ফসল কাটতে হবে। অতি কাঁচা অবস্থায় কাটলে দানায় অপুষ্টি ও ভাঙার হার বাড়তে পারে। আবার অতিরিক্ত দেরিতে কাটলে ঝরে পড়া, পাখির ক্ষতি, শীষ ভেঙে যাওয়া বা জমিতে হেলে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। সাধারণভাবে প্রায় ৮০–৮৫ শতাংশ দানা পেকে গেলে কাটার সময় বিবেচনা করা যায়। তবে মাঠের অবস্থা ও ধানের আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ করা উত্তম।

মাড়াই ও শুকানো

সুগন্ধি চিকন ধানের ক্ষেত্রে ধান কাটার পরবর্তী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালো জাতের ধান থেকেও ভুল মাড়াই ও শুকানোর কারণে নিম্নমানের চাল পাওয়া যেতে পারে। মাড়াইয়ের সময় দানার ক্ষতি কমাতে হবে। পরিষ্কার ও আলাদা যন্ত্র ব্যবহার করা ভালো। মাড়াইয়ের পর ধান পরিষ্কার জায়গায় শুকাতে হবে। ধান ভালোভাবে শুকিয়ে নিরাপদ আর্দ্রতায় আনতে হবে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের সুগন্ধি ধান চাষ নির্দেশনায় ধান শুকিয়ে আর্দ্রতা প্রায় ১২ শতাংশের নিচে আনার কথা বলা হয়েছে।

চাল তৈরিতে বিশেষ সতর্কতা

ব্রি ধান১০৪-এর মূল্য শুধু ধানের ফলনে নয়, উচ্চমানের লম্বা-চিকন চাল পাওয়ার ওপরও নির্ভর করে। তাই সাধারণ ধানের মতো অসতর্কভাবে ধান ভাঙানো উচিত নয়। গবেষণায় ব্রি ধান১০৪-এর head rice yield প্রায় ৫৭.২ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে। চালকল নির্বাচনের সময় আধুনিক রাবার রোলার বা উপযুক্ত মিলিং ব্যবস্থা ব্যবহার করলে দানা ভাঙার হার কমানো সম্ভব হতে পারে। কৃষি তথ্য সার্ভিসও লম্বা আকারের সুগন্ধি ধানে রাবার হলার ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।

চালের বাজারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

আপনার উল্লেখ করা প্রতি কেজি ২৩০ টাকা খুচরা বাজারদর ধরে দেখলে ব্রি ধান১০৪-এর মতো প্রিমিয়াম সুগন্ধি চালের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সহজেই বোঝা যায়। তবে মনে রাখতে হবে—কৃষক সাধারণত খুচরা পালিশ করা চালের পুরো ২৩০ টাকা/কেজি পান না। ধান থেকে চাল উৎপাদনের সময় তুষ, কুঁড়া ও ভাঙা চাল বাদ যায়। মিলিং খরচ, পরিবহন, প্যাকেজিং, ব্যবসায়ীর মার্জিন ও বাজারজাতকরণ খরচও থাকে। তাই কৃষকের প্রকৃত আয় নির্ধারণের সময় ধানের বিক্রয়মূল্য বা মিলিং-পরবর্তী কৃষকের প্রাপ্ত নিট মূল্য দিয়ে হিসাব করতে হবে। ব্রি ধান১০৪-এর গড় ফলন ৭.২৯ টন/হেক্টর এবং অনুকূল পরিবেশে ৮.৭১ টন/হেক্টর পর্যন্ত সম্ভাব্য ফলন উল্লেখ করা হয়েছে। অতএব, উচ্চমূল্যের বাজারের সঙ্গে যদি কৃষক উৎপাদন, মিলিং ও সরাসরি বিপণন যুক্ত করতে পারেন, তাহলে এই জাতকে ঘিরে প্রিমিয়াম রাইস ভ্যালু চেইন গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

বাণিজ্যিক চাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল

ব্রি ধান১০৪ চাষকে শুধু ধান উৎপাদন হিসেবে না দেখে “প্রিমিয়াম সুগন্ধি চাল উৎপাদন প্রকল্প” হিসেবে পরিকল্পনা করা বেশি কার্যকর। প্রথমে মানসম্মত বীজ সংগ্রহ করতে হবে। এরপর একই জাতের আলাদা জমি নির্বাচন করে জাতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে হবে। সার ও সেচের ব্যবস্থাপনা করতে হবে মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী। ধান কাটার পর অন্য জাতের ধানের সঙ্গে মেশানো যাবে না। সম্ভব হলে কৃষক দলবদ্ধভাবে একই জাতের ধান উৎপাদন করে সরাসরি মিলার, চাল ব্যবসায়ী, সুপারশপ বা ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক বাজার তৈরি করতে পারেন। এতে প্রিমিয়াম মানের চালের জন্য আলাদা বাজার সৃষ্টি করা সহজ হতে পারে।

সম্ভাব্য ঝুঁকি

উচ্চমূল্যের ধান মানেই ঝুঁকিমুক্ত ফসল নয়। ব্রি ধান১০৪-এর ক্ষেত্রে প্রধান ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বীজের বিশুদ্ধতা নষ্ট হওয়া, অনুপযুক্ত জমি, অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ, সেচের পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, রোগ-পোকার আক্রমণ, ধান কাটতে বিলম্ব, ভুলভাবে শুকানো, অতিরিক্ত মিলিং এবং বাজারে সাধারণ চালের সঙ্গে মিশে যাওয়া। বিশেষ করে কৃষক যদি ২৩০ টাকা কেজি খুচরা চালের দামকে নিজের নিশ্চিত বিক্রয়মূল্য ধরে উৎপাদন পরিকল্পনা করেন, তাহলে ভুল অর্থনৈতিক হিসাব হতে পারে। তাই চাষের আগে স্থানীয় বাজারে ধানের সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য, মিলিং খরচ এবং চালের পাইকারি মূল্য যাচাই করা উচিত।

কারা ব্রি ধান১০৪ চাষ করবেন

যেসব কৃষকের—

  • বোরো মৌসুমে নির্ভরযোগ্য সেচ সুবিধা আছে,
  • মাঝারি উর্বর ও উপযুক্ত জমি আছে,
  • মানসম্মত বীজ সংগ্রহের সুযোগ আছে,
  • ফসল পর্যবেক্ষণে আগ্রহ আছে,
  • আলাদা করে সুগন্ধি ধান সংরক্ষণ ও বিক্রির ব্যবস্থা আছে এবং
  • প্রিমিয়াম বাজারে বিক্রির সুযোগ রয়েছে,

তাদের জন্য ব্রি ধান১০৪ বিশেষভাবে বিবেচনাযোগ্য।

উপসংহার

বাংলাদেশে সুগন্ধি, চিকন ও প্রিমিয়াম চালের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চফলনশীল সুগন্ধি ধানের বাণিজ্যিক গুরুত্বও বাড়ছে। ব্রি ধান১০৪ এই পরিবর্তিত বাজারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য জাত। এর চাল অতিরিক্ত লম্বা ও চিকন, বাসমতি টাইপের, সুগন্ধিযুক্ত এবং রান্নার পর ঝরঝরে। ব্রির তথ্য অনুযায়ী জাতটির গড় ফলন ৭.২৯ টন/হেক্টর এবং উপযুক্ত পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনায় ৮.৭১ টন/হেক্টর পর্যন্ত ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই জাতের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে মানসম্মত বীজ, সঠিক সময়ে ৩৫ দিনের মতো সুস্থ চারা রোপণ, ২০×২০ সেন্টিমিটার দূরত্ব, মাটিভিত্তিক সুষম সার ব্যবস্থাপনা, পানি সাশ্রয়ী সেচ, রোগ-পোকা পর্যবেক্ষণ, সময়মতো কর্তন এবং উন্নত মিলিং ও বাজারজাতকরণের ওপর। ব্রির গবেষণাতেও ৩৫ দিনের চারা ও ২০×২০ সেন্টিমিটার রোপণ ব্যবস্থাপনার উদাহরণ পাওয়া যায়। অতএব, ২৩০ টাকা কেজি বা তার কাছাকাছি খুচরা বাজারদরের আকর্ষণকে সামনে রেখে শুধু উৎপাদন নয়, “বীজ থেকে বাজার পর্যন্ত” সম্পূর্ণ ভ্যালু চেইন বিবেচনায় নিয়ে ব্রি ধান১০৪ চাষ করা উচিত। তাহলেই ‘বাংলার বাসমতি’ ধরনের এই সুগন্ধি চিকন চাল বাংলাদেশের কৃষকের জন্য একটি সম্ভাবনাময় প্রিমিয়াম কৃষিপণ্য হিসেবে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

 

তথ্যসূত্র:

১. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) — উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের সাফল্য ও ব্রি ধান১০৪-এর জাত বৈশিষ্ট্য।

২. Kader, M. A. et al. (2023). BRRI dhan104: BRRI’s Basmati Type Aromatic Rice Variety for Irrigated Ecosystem in Bangladesh. Asian Journal of Advances in Agricultural Research, 22(4), 34–42.

৩. বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI), Annual Research Review Workshop 2024–25 — ব্রি ধান১০৪-এর চারা বয়স, রোপণ দূরত্ব ও সার ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত গবেষণা তথ্য।

৪. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS), কৃষি মন্ত্রণালয় — সুগন্ধি ধানের সম্ভাবনা, চাষ পদ্ধতি, রোগ ব্যবস্থাপনা, কর্তন ও শুকানোর নির্দেশনা।

৫. কৃষি তথ্য সার্ভিস (AIS) — বাংলাদেশে সুগন্ধি চালের উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজার সম্ভাবনা।